আইরিস স্ক্যানিং

আইরিস স্ক্যানিং প্রযুক্তি কি? এবং এটি কিভাবে কাজ করে?

আইরিস স্ক্যানিং
আইরিস স্ক্যানিং

আমার এক বন্ধু আছে,যে হ্যাকিং এ যথেষ্ট পারদর্শী। তো একদিন তার অ-বর্তমানে তার পি,সি টা একটু ঘাটাঘাটি করব ভাবলাম। কিন্তু,বিপত্তি ঘটল পি,সি টা অন করতে গিয়ে।কিছুতেই অন হয়না।বারবার ফেইলড হয়। যদিও পাস্‌ওয়ার্ড বা পিন কোড জাতিয় কিছি দেখলাম না!
তো,যখন সে আসল তখন তাকে বললাম,”আসলে কাহিনি কি?”
সে বলল,”মামা,সব্‌ই আইরিস স্ক্যানিং এর খেল! আমার চোখের আইরিস এর সাথে না মিলা পর্যন্ত পি,সি অন হবে না।”
তারপর সে পি,সি’র সামনে বসা র পর পি,সি অন হয়ে গেলো।
তো এই আইরিস স্ক্যানিং টা আসলে কি?এটা কিভাবে কাজ করে এবং কতটুকু নিরাপদ? চলুন, এই ব্যাপারে  বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাকঃ

আইরিস স্ক্যানিং কি?
আইরিস স্ক্যানিং কি?

আইরিস স্ক্যানিং কি?

আইরিস স্ক্যানিং প্রযুক্তি’র ব্যাপারে জানার আগে জানতে হবে,আইরিস টা আসলে কি?
শারির বিদ্যার ভাষায়,আইরিস হলো মানুষ সহ অন্যান্য যে সকল মেরুদণ্ডী প্রাণী রয়েছে তাদের চোখের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশটিই হলো মূলত আইরিস।। আমাদের চোখের গঠন মোটামুটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। আমাদের চোখের সাদা অংশটির নাম স্ক্লেরা,আর আমাদের চোখের যে অংশটির রং একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রং এর হয়ে থাকে তার নাম আইরিস ।
স্ট্রোমা নামক এক ধরনের রঞ্জকজাতীয় ফাইব্রোভাস্কুলার টিস্যু দ্বারা আইরিস গঠিত। এটি করনিয়ার নীচে এবং লেন্স এর ওপরে অবস্থিত একটি স্তর। এটির কেন্দ্রে অবস্থিত ক্ষুদ্র ছিদ্রটিকে তারারন্ধ্র বা পিউপিল [pupil] বলে।

চোখের মাঝে সবুজ/ধূসর/বাদামী রঙের যে অংশটি রয়ছে সেটাকে আইরিস বলা হয়ে থাকে।আইরিসে স্ট্রোমা এবং আইরিস পিগমেন্টেড এপিথেলিয়াম নামের দুইটি স্তর থাকে।মানুষের চোখের আইরিসে সাধারণত মেলানিন পিগমেন্ট থাকে এই মেলানিন পির্মেন্ট গুলো মূলত গাঢ় বাদামী রং এর এক ধরনের দানাদার পদার্থ। আমাদের চোখের রং এর তারতম্য নির্ভর করে এই মেলানিন পিগমেন্ট এর পরিমানের উপর। যার আইরিসে  মেলানিন এর ঘনত্ব যত বেশী তার চোখের রং ও তত বেশি গাঢ় হয়।

আইরিস
আইরিস

একেকজন মানুষের হাতের ছাপ যেমন একেক রকম হয়,চোখের আইরিস্‌ও তেমন একেক জনের একেক রকম হয়। প্রতিটি মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে আমৃত্যু পর্যন্ত আইরিস এর প্যাটার্ন আলাদা আলাদা রকমের হয়ে থাকে। কার্‌ও সাথে কার্‌ও আইরিস এর মিল থাকেনা।
তাইতো প্রযুক্তিবীদ’রা এই দারুন ব্যাপারটা কে কাজে লাগিয়ে অন্যতম একটা সিকিউরিটি প্রযুক্তি গড়ে তুলেছে। এটিই হলো মূলত, আইরিস স্ক্যানিং প্রযুক্তি।

তবে উল্লেখ্য,বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বড় হবার সময়,অনেক সময় চোখের আইরিস পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। তবে সক্ষেত্রে ২/৩ বছর বয়সের পর আর তা পরিবর্তন হয়না। আজীবন অপরিবর্তিত থেকে যায়।

এটি কিভাবে কাজ করে?
এটি কিভাবে কাজ করে?

এটি কিভাবে কাজ করে?

আমি আগেই বলেছি আমাদের চোখের আইরিস প্যাটার্ন একেকজনের একেক রকম তাই কার্‌ও সাথে কার্‌ও মিল হয়না। আইরিস স্ক্যানিং আপনার চোখের প্যাটার্ন স্বীকৃত।যাতে এটি আপনার চোখের আইরিসের সাথে সাদৃশ্য হয় এবং আপনাকে ইতিবাচক হিসেবে চিনহিত করতে পারে। আইরিস স্ক্যানার সূক্ষ্ম ইনফ্রারেড আলোকসজ্জা বিশিষ্ট ভিডিও ক্যামেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে।  আইরিস স্ক্যানারে একটি ইনফ্রারেড ক্যামেরা এবং একটি সাধারন ভিডিও রিগুলেশন ক্যামেরা লাগানো থাকে। এই দুই ক্যামেরা চোখের আইরিস এর অনেক হাই-রেজুলেশন ফটো তুলতে পারে। এটি দুটি সতন্ত্র পর্যায়ে কাজ করে।প্রথমত এটিতে সংযুক্ত করে রাখা আইরিস প্যাটার্ন সনাক্ত করে এবং তারপর তা ভেরিফাই বা যাচায় করে তারপর তা ফলাফল প্রদর্শন করে।

প্রথম্র ব্যক্তি কে  ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখ ডিজিটালরূপে সাধারণ হালকা এবং অদৃশ্য ইনফ্রারেড উভয় ভাবে ছবি তোলা হয়। (একধরনের নাইট দৃষ্টি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়,যা হালকা এক ধরনের সাধারণ লাল আলোর চেয়ে সামান্য লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশিষ্ট্য।) সাধারণ আলোকে পরিষ্কারভাবে স্ট্যান্ড আউট না হতে পারা,চোখের অনন্য বৈশিষ্ট্য গুলোকে   নাইট দৃষ্টি সিস্টেম ব্যাবহার করে ইনফ্রারেড রহস্যময়ভাবে প্রদর্শিত করতে সাহায্য করে।  ফটো তোলার পরে স্ক্যানারটি আইরিস থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। এই দুটি ডিজিটাল ফটোগ্রাফ একটি কম্পিউটার দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয়। যা অপ্রয়োজনিয় বিস্তারিত অংশ গুলো সরিয়ে ফেলবে,এবং আইরিসের আশেপাশের প্রায় ২৪০ টি ফ্যাচার আইডেন্টিফাই করবে।ফ্যাচার গুলো সংগ্রহ করে আইডেন্টিফাই করার পরে এই তথ্যকে একটি এনক্রিপ্ট করা কোড এ পরিবর্তন করে। এই সব গুলো ফ্যাচার বা পয়েন্ট যদি ব্যাক্তির আইরিসের সাথে মিলে যায় তবেই স্ক্যানার  টি ইতিবাচক ফলাফল নিদর্শন করবে।

আইরিস স্ক্যানার  মূলত এই কোড গুলোই সংরক্ষন করে রাখে।এবং পরবর্তিতে ব্যাক্তি যত বার এক্সেস পেতে স্ক্যানিং করবে ততবার স্ক্যানার তার সমস্ত তথ্য খুঁতিয়ে দেখে সেগুলো কে একটি কোডে পরিনত করবে।এরপর তা পূর্বেকার স্টোরেজ বা সেইভ কৃত কোড গুলোর  মিলিয়ে দেখবে। যদি মিলে যায় তবেই এক্সেস প্রদান করবে অন্যথায় ফেইল বা নট ম্যাচ দেখাবে। এই প্রক্রিয়া টি সম্পন্ন হতে মিনিট কয়েক মত সময় লাগে।

এই প্রযুক্তি কতটুকু নিরাপদ?
এই প্রযুক্তি কতটুকু নিরাপদ?

এই প্রযুক্তি কতটুকু নিরাপদ?

আইরিস স্ক্যানিং অতি জটিল ধরণের একটি প্রযুক্তি।বায়োমেট্রিক এর মত কাজেও এই প্রযুক্তির প্রয়োগ এখনো করা হয়না। সেখানে ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যাবহার করা হয়।যদিও ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রযুক্তির চেয়ে আইরিস স্ক্যানিং বেশি উন্নত এবং নিরাপদ। কেননা,ফিঙ্গার প্রিন্ট এ যেখানে মাত্র ৪০+ ফ্যাচার মিলে গেলেই এক্সেস প্রদান করে দেয়, আইরিস স্ক্যানিং এ সেখানে প্রায় ২৫০ টির বেশি ফ্যাচার মিলে গেলে তবেই এক্সেস প্রদান করে। এটা দশ বার আঙ্গুলের ছাপ এর চেয়ে আরো সঠিক ভাবে অনুমান করা যায়।

আইরিস স্ক্যান এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল তার সঠিকতা এবং নির্ভরযোগ্যতা। অন্যান্ন প্রযুক্তি যেমন,পাস্‌ওয়ার্ড,ফিঙ্গার প্রিন্ট, প্রভৃতি হ্যাক করা যতটা সহজ এই প্রযুক্তি হ্যাক করা ততটা সহজ নয়।
যেমন ধরুন, আমরা প্রায়্‌ই থ্রীলার মুভি তে দেখতে পায়,
একটি সিনুক ভর্তি হিরা আছে। সেই সিন্দুল বা লকারে বিশেষ ধরনের শক্তিশালী পাস্‌ওয়ার্ড দেওয়া আছে।যেটা কেবল লকারের মালিক অর্থাৎ বিশেষ ব্যাক্তিই জানে। কিন্তু, হ্যাক করে বা গোপন কোন ক্যামেরার মাধ্যমে অন্য কেউ সেই পাস্‌ওয়ার্ড জেনে ফেলতে পারে।
আবার ধরুম,লকার’টিতে ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যাবহার করা হয়েছে। তো সে ক্ষেত্রে ব্যাক্তির আঙ্গুল এর ছাপ কে ব্যাবহার করে প্লাস্টিকের নকল আঙ্গুল বানিয়ে কিংবা ব্যাক্তিকে অজ্ঞান করে তার হাতের ছাপ সহজেই নেওয়া যায়।
কিন্তু, আইরিস স্ক্যানিং এ,এরকম করা টা সহজ নয়। কেননা, আগেই বলেছি এই প্রযুক্তি অনেক গুলো ফ্যাচারকে আইডেন্টিফাই করে। তারপর এক্সেস দেয়।স্ক্যানার এর হাই-রেগুলেশন ক্যামেরা আপনার চোখ কে যহেষ্ট খুঁটিয়ে দেখবে। সেই সাথে এটাও দেখবে আপনার চোখ জীবন্ত কি-না! তাছাড়া এটিকে টাচ করার প্রয়োজন হয় না।স্ক্যানার এর সামনে দাড়ালেই কাজ শুরু হয়ে যায়।
আপনাকে খুব ভালভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তবেই এক্সেস দিবে। তাই এখানে চিটারি বা কোন বাইপাস করাও খুব-ই জটিল ব্যাপার।
তাই এই প্রক্রিয়া কে অন্য গুলোর তুলনায় নিরাপদ্‌ই বলা চলে।

পরিশিষ্ট্যঃ 

এই জটিল প্রক্রিয়া টি এখনো পরিক্ষণ চলছে।এবং এটি বহুল ভাবে এখনো ব্যাবহার করা হয় না।কিছু কিছু ফোনে এই ফ্যাচার টি যদিও সংযুক্ত ছিল কিন্তু তা তুলনামূলক অনূন্নত।
অবশ্য উন্নত দেশ গুলোতে এই প্রযুক্তির ব্যাবহার বাড়ছে।এবং শীঘ্রই এটি আর্‌ও বেশি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করবে।
নিজের সম্পদ কে বেশি সিকিউরিটি দিয়ে সংরক্ষিত রাখতে কে-না চায়?

ধন্যবাদ।আশা করি কিছুটা অন্তত বোঝাতে পেরেছে আপনাকে আইরিস স্ক্যানিং প্রযুক্তি’এর সম্পর্কে। আমাদের সাথেই থাকুন এবং জ্ঞানের বিকাশ ঘটান।

আর্‌ও পড়ুনঃ 

 

Rubayed Drishty

1 comment